26 C
Dhaka
Sunday, November 27, 2022

কোরাল পাথর ঘেরা এক অপূর্ব সৈকত; ইনানী সমুদ্র সৈকত

ইনানী সমুদ্র সৈকত : নাগরিক দৌড়-ঝাপে যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত, তখন ছুট পেলেই সুনীল সাগরের জলে পা ভেজানোর সুযোগ কেইবা হাতছাড়া করে। সকল ভ্রমণ প্রেমীদের অবকাশ যাপনের সবচেয়ে প্রিয় গন্তব্য স্থল হল সমুদ্র সৈকত। সাগর পাড়ে নিবিড় প্রশান্তিতে অবকাশ যাপনের জন্য কক্সবাজারই সবার প্রথম পছন্দ। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্র সৈকতের মধ্যে সৌন্দর্য প্রেমীদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও প্রিয় সৈকত হল ইনানী সমুদ্র সৈকত বা ইনানী বিচ। কোরাল পাথর ঘেরা এক অপূর্ব সৈকত এই ইনানী বিচ। সমুদ্রের নীল জলরাশি আর সারি সারি পাথরের মেলা। পাথরগুলো একবার সমুদ্রের জলে ডুব দেয় আবার যেন ভেসে ওঠে। কোন কোন সময়ে পাথরের উপর দাঁড়ালে মনে হবে যেন সমুদ্রের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে। সে এক অপার্থিব অনুভূতি। পাথরগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে অস্তগামী সূর্যের সৌন্দর্য কল্পনাকেও হার মানায়। গোধূলি বেলার রক্তিম আভা ও বীচের রঙ যখন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখন চারপাশের সৌন্দর্য দেখে মনে হয় যেন মুঠো মুঠো সোনা ছড়িয়ে আছে পুরো সৈকত জুড়ে।

ইনানী সমুদ্র সৈকতকক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার ও হিমছড়ি থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দক্ষিণে প্রবাল গঠিত সমুদ্র ইনানীর অবস্থান। কক্সবাজারের কলাতলী থেকে ছোট বাস, অটোরিকশা, সিএনজি, বা জীপে করে চলে যেতে পারেন ইনানীতে। একটি জীপে ১০-১৫ জন যাওয়া যায়।

আপনি যদি টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ দিয়েইনানী সমুদ্র সৈকত যান তবে যাবার পথে আপনার দু চোখ জুড়িয়ে দেবে উঁচু উঁচু পাহাড় আর উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ। পুরো সময়টা আপনি থাকবেন এক ধরণের সুন্দর দোটানায় । এক পাশে পাহাড় আরেক পাশে সাগর। কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবেন। মন চাইবে দুপাশের সৌন্দর্য একসাথে দেখতে। ক্ষিপ্রগতিতে যখন জিপ ছুটে চলে খোলা জিপের উপর দাড়িয়ে দুপাশে তাকালে মনে হবে যেন স্বপ্নে দেশে ভেসে যাচ্ছেন। এটি হতে পারে আপনার জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা। এরপর বেশ উঁচু একটা ব্রিজ পার হয়ে শুরু হবে হিমছড়ির রাস্তা।

আরও দেখুনঃ- ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজ।

রাস্তার একপাশে থাকবে উঁচু পাহাড় আরেক পাশে সাগর। নানা রকম পাখির কলতান শুনতে শুনতে আপনি রোমাঞ্চিত হবেন। পাহাড়ে নানা রকম ঝোপঝাড়ের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্র সৈকত পাড়ে দেখা যায় সুদূর ঝাউ গাছের সারি। মাঝে মাঝে নারিকেল গাছের এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সৌন্দর্যের ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করে। জায়গায় জায়গায় দেখবেন পাহাড়ি ছোট ছোট ঝরনা। শুকনা মৌসুমে হয়তো সবটাতে পানি দেখবেন না। রাস্তার ওপর পাশে সাগর। মাঝে মাঝে দেখবেন জেলে নৌকা বালির উপর সারি করে রাখা আছে।

ইনানী সমুদ্র সৈকত
ইনানী সমুদ্র সৈকত

ইনানী সমুদ্র সৈকত :-

প্রথমে ঢাকা থেকে আপনাকে কক্সবাজার আসতে হবে। কক্সবাজার আসতে বিভিন্ন ধরণের এসি-নন এসি বাস সার্ভিস রয়েছে। এদের মধ্যে সৗদিয়া, এস আলম এর মার্সিডিজ বেঞ্জ, গ্রিন লাইন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, সোহাগ পরিবহন, এস.আলম পরিবহন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বাস ভেদে ভাড়া জনপ্রতি ৮০০ থেকে ২৫০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া ঢাকা থেকে ট্রেনে করে চট্টগ্রাম হয়ে আপনি কক্সবাজার যেতে পারবেন। আর যদি বাজেট নিয়ে কোন টেনশন না থাকে তবে কক্সবাজার যাবার জন্য আকাশ পথ বেছে নিতে পারেন। এক্ষেত্রে সময় এবং বিমানের ক্লাস ভেদে আপনার ৩৫০০ থেকে ১১,০০০ টাকার মত লাগবে।

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত থেকে সবসময় ইনানী সমুদ্র সৈকত যাবার খোলা জীপ পাওয়া যায়। রিজার্ভ গেলে বেশি টাকা লাগে আলোচনা সাপেক্ষ্যে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকায় যাওয়া যায়। একটি জীপে ১২ থেকে ১৫ জন অনায়াসেই বসা যায়। অটোরিকশায়/ইজিবাইক করে ইনানী সমুদ্র সৈকত যাওয়া ও আসা সহ সিজন ভেদে ভাড়া লাগবে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। এছাড়া লোকাল সিএনজি তে করে জনপ্রতি ৮০ টাকা ভাড়ায় ইনানী সী বিচ যাওয়া যায়।

যেখানে থাকবেন: ইনানী বিচের আশেপাশে কিছু হোটল ও রিসোর্ট আছে। তার মধ্যে রয়েল ফাইভ স্টার টিউলিপ সী পার্ল রিসোর্ট, ইনানী রয়াল রিসোর্ট, লা বেল্যা রিসোর্ট উল্লেখযোগ্য। তবে কক্সবাজার থেকে কাছে হওয়ায় এবং অনেক হোটেল থাকায় কক্সবাজারে থাকাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। সাধারণত দামানুসারে কক্সবাজার হোটেল/মোটেল/রিসোর্ট গুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।

৬০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা: মারমেইড বিচ রিসোর্ট, সায়মন বিচ রিসোর্ট, ওশেন প্যারাডাইজ, লং বীচ, কক্স টুডে, হেরিটেজ ইত্যাদি। ৩,০০০ থেকে ৬,০০০ টাকা: সী প্যালেস, সী গাল, কোরাল রীফ, নিটোল রিসোর্ট, আইল্যান্ডিয়া, বীচ ভিউ, সী ক্রাউন, ইউনি রিসোর্ট ইত্যাদি। ৮০০ থেকে ৩,০০০ টাকা: উর্মি গেস্ট হাউজ, কোরাল রীফ, ইকরা বিচ রিসোর্ট, অভিসার, মিডিয়া ইন, কল্লোল, হানিমুন রিসোর্ট, সেন্টমার্টিন রিসোর্ট, নীলিমা রিসোর্ট ইত্যাদি।

তবে উপরে উল্লেখিত মূল্যের চেয়েও কমে হোটেল পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে একটু আগে থেকেই খোঁজ খবর নিতে হয়। অফসিজনে হোটেলের ভাড়া সাধারণত অর্ধেকেরও কম থাকে। সময় থাকলে কক্সবাজার নেমেই একটু দরদাম করে হোটেল খুঁজে নিলেই ভালো। কম দামে কোন হোটেল বা রিসর্টে থাকতে চাইলে আপনি কলাতলি বিচ থেকে একটু দূরে লং বিচ হোটেলের সামনে উল্টোপাশের গলির ভিতরের হোটেল গুলোতে খুঁজ নিতে পারেন। বিচ ও মেইন রোড থেকে হোটেল যত দূরে হবে থাকার ভাড়া সাধারণত কম হয়ে থাকে। হোটেল খোঁজার ক্ষেত্রে রিকশাওয়ালা বা সিএনজিওয়ালার পরামর্শে নেয়া উচিত নয়। প্রয়োজনে হোটেলের ফেইসবুক পেইজ বা ওয়েবাসাইট থেকে তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে।

আপনি যদি আপনার পরিবার নিয়ে একটু স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করতে চান তবে ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে পারেন। এসি/নন এসির ২/৩/৪ বেড রুম ও রান্নাঘর বিশিষ্ট ফ্ল্যাটের প্রতিদিন ভাড়া হতে পারে ২,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকা। এছাড়াও নিজের সাধ্য ও পছন্দমত একটা ঠিকানা পেতে আপনাকে তো একটু খোঁজাখুঁজি করতে হতেই পারে।

কোথায় কি খাবেনঃ আনায়াসেই ৫-৬ ঘন্টায় ইনানী বীচ থেকে ঘুরে আসা যায় তাই চাইলে হালকা শুকনো খাবার সাথে রাখতে পারেন কিংবা পুনরায় কক্সবাজার ফিরে খেতে পারেন। কক্সবাজারে খাবার জন্য বিভিন্ন মানের রেস্তোরাঁ রয়েছে। মধ্যম মানের রেস্টুরেন্টের মধ্যে রোদেলা, ঝাউবন, ধানসিঁড়ি, পৌষি, নিরিবিলি ইত্যাদি উল্লেখ করার মত।

ইনানী সমুদ্র সৈকত ভ্রমণ টিপস

  • অফ সিজনে গেলে বা ছুটির দিন গুলো পরিহার করে ভ্রমণে গেলে খরচ কম হবে।
  • কম দামে হোটেলে থাকার জন্যে বিচ থেকে দূরে লাবনী পয়েন্টের হোটেল গুলোতে থাকতে পারেন।
  • যাতায়াত বা খাওয়া দাওয়ার জন্যে সবকিছুতেই ভালো করে দরদাম করে নিবেন।
  • চেষ্টা করুন বিকেলের সময়টা ইনানী সমুদ্র সৈকত বিচে কাটানোর।
  • হাতে সময় নিয়ে বের হন, মেরিন ড্রাইভ ও হিমছড়িতে চাইলে কিছু সময় ব্যয় করতে পারেন।
  • সিজনে (ডিসেম্বর-মার্চ) সরকারি ছুটির দিন ব্যাতিত দিন গুলোতে গেলে আগে থেকে হোটেল বুক করার প্রয়োজন হবে না।
  • রিক্সাওয়ালা ও ইজিবাইক চলকরা দালাল, হোটেল রুম ঠিক করে দেবার জন্যে বলতে পারে, তাদের পরিহার করুন।
  • বিচে নামার সময় সতর্ক থাকুন, জোয়ার ভাটার সময় দেখে নিন।

সূত্রঃ- Travel bd  ,ভ্রমণ গাইড, উইকিপিডিয়া

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Leave a Reply

লেখক থেকে আরো