কৃষি, কৃষক ও বাংলাদেশ।

কৃষি, কৃষক ও বাংলাদেশ ।


বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। দেশের প্রায়, ৮০-৮৫ ভাগ মানুষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কৃষি কাজের সাথে জড়িত। এই লাইন গুলো আমাদের সকলের কাছেই অত্যন্ত সু-পরিচিত কারন বাংলাদেশ সম্পর্কিত কিছু পড়তেগেলে এই লাইন গুলো বুলি আওড়ানোর মতো লক্ষ্য করবেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, কৃষি প্রধান এই দেশে কৃষকেরাই মারাত্নকভাবে অবহেলিত। তাদের সমস্যা গুলোর টেকসই সমাধান(sustainable solution) যেন কোন ভাবেই হচ্ছে না। এর কারন খুঁজতে গিয়ে একটা বিষয় গভীর ভাবে উপলব্ধি করলাম যে; আপনি তখনই কোন সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করবেন, যখন আপনি নিজে সেই সমস্যায় পড়বেন।


চোখে দেখা না গেলেও প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় আমরা নিজেদের ৩ শ্রেনিতে ভাগ করে নিয়েছি।অর্থনীতির ভাষায় একে বলে supply chain. যেখানে producer (কৃষক) শুধু উৎপাদন করছে। একদল ধনী মধ্যস্বত্বভোগীরা উৎপাদিত পন্যের বাজার দর নিয়ন্ত্রন করে, কম দামে কৃষকদের কাছ থেকে পন্য কিনে ভোক্তা শ্রেনির কাছে বিক্রি করছে।আর এদিকে কৃষকের সমস্যার চাবিকাঠি যাদের হাতে তারা হলো এই ভোক্তা শ্রেনি, যারা কৃষকের এসকল সমস্যা থেকে শত মাইল দূরে।


বর্তমানে আমাদের দেশে কৃষক সমাজের সমস্যার মূলে প্রধানত রয়েছে উৎপাদন খরচ অনুযায়ী ফসলের দাম না পাওয়া। গত কয়েক বছরে উৎপাদন খরচ বাড়ার সাথে সাথে আরো যুক্ত হয়েছে প্রকট শ্রমিক সঙ্কট। সনাতন এই কৃষি ব্যবস্থায় চড়া দামে শ্রমিক নিয়ে কাজ করে কৃষকরা আরো ঘোরতর বিপদে পড়েছেন। এর সাথে আবার রয়েছে সার, বীজ,কীটনাশক ও সেচ ব্যবস্থার জন্য অতিরিক্ত মূল্য।

ঠিক এমন টাই হয়েছিল ২০১৯ সালে,কৃষকরা ধানের দাম না পেয়ে ধান ক্ষেতে আগুন দেওয়া শুরু করে। নিজের পাকা ধানে আগুন লাগিয়ে ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, টাঙ্গাইলের কৃষক আবুল মালেক সিকদার। এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর কৃষকের ন্যায্যমূল্যের দাবি ওঠে সারাদেশে। তাই কৃষকের সমস্যা সমাধানের জন্য দুটি বিষয় বিবেচনায় রাখা যেতে পারে।

১| উৎপাদন খরচ কমানো ২| কাঁচা বাজারকে অনলাইন তদারকির ব্যবস্থা করা।

যেহেতু সকল বিষয়ে উন্নত বিশ্বকে অনুসরণ করছি তখন কৃষিতে কেনো নয়? আমাদের সুবিধা মতো এখানে টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একটা উদাহরন দিলেই আপাত বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ধরুন আপনি আপনার ১ বিঘা জমির ধান কাটবেন। এখানে আপনার কমপক্ষে ৫ জন শ্রমিক দরকার। দৈনিক ৫০০ টাকা মুজুরী ধরলেও আপনার খরচ পড়বে প্রায় ২৫০০ টাকা।তবে সেখানে যদি আপনি rice reaper বা combined harvester ব্যবহার করেন আপনার বড়জোর খরচ পড়বে ৫০০-৮০০ টাকা, সাথে সময়ের অপচয় ও রোধ হবে।এখন একবার ভেবে দেখুন শুধুমাত্র ফসল তোলার সময় একটা প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কতটা কমিয়ে ফেলতে পারছেন।


বাংলাদেশ সরকার কৃষিজাত যন্ত্রপাতিতে ২৫%(এই অর্থ বছরে ৫০%) ভর্তুকি প্রদান করে থাকে। যেটা হয়তো আমি জানি, আপনি জানেন, কিন্তু একজন গ্রামের কৃষককে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানান, আদৌতে তিনি এমন কিছুই শোনেন নি। তাই কৃষি প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও এর কার্যকরীতা স্বচক্ষে দেখিয়ে কৃষকদের কৃষিযন্ত্রপাতি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।তবে এতো কিছুর মধ্যে আশার ব্যপার এই যে, কৃষি কাজে শ্রমিক সংকটের সাথে কৃষি কাজে প্রযুক্তি ব্যবহারের একটা পজিটিভ দিক আছে। একমাত্র শ্রমিক সংকট হলেই মানুষ প্রযুক্তিকে সাদরে গ্রহন করে।

২.কৃষকের সকল কাচামালের উৎপাদন খরচ ও সার্বিক দিক বিবেচনায় রেখে অনলাইন প্লাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে। যেখান থেকে তৈরিকৃত কাচামালের সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে। মূলত এই প্লাটফর্ম থেকেই ভোক্তা, পাইকার ও উৎপাদনকারীর একটা সমন্বয় হবে। সরকার ইচ্ছে করলে এখান থেকে ন্যায্যমূল্যে মজুদকৃত খাদ্যদ্রব্য কিনতে পারে।


দ্বিতীয় যে সমস্যা কথা আলোচনা করবো সেটা ঠিক কৃষকের একার সমস্যা না। এটা পুরো জাতির জন্যই হুমকিস্বরূপ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে মোট আবাদ যোগ্য জমির পরিমান ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর।অন্যদিকে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র রিপোর্ট অনুযায়ী মোট ফসলি জমির পরিমান ৭৯ লক্ষ ৪৭ হাজার হেক্টর।বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টকে ধরে নিয়ে মোট জনসংখ্য ১৮ কোটি হিসেবে মাথা পিছু জমির পরিমান দাড়ায় মাত্র ০.৪৪ হেক্টর।

তাছাড়া ঘরবাড়ি, পুকুর, ফ্যাক্টরি, রাস্তাঘাট নির্মানে প্রতিবছর একটা বড় অংকের জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে প্রতি বছর জমির পরিমান ১ শতাংশ হারে হ্রাস পাচ্ছে।তাহলে প্রতিদিনই কমছে প্রায় ২১৯ হেক্টর আবাদি জমি। এখন আপনিই হিসেব কষুন তো এই কৃষি প্রধান দেশ যার ৮০ ভাগ মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল,তাদের আবাদি জমি যদি এভাবে কমে যায় তাহলে ২০৩০ সাল নাগাদ তারা কোথায় গিয়ে পড়বে?
কৃষি জমির সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন’ -২০১৫ এর ৪ এর ১ নং অনুচ্ছেদে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ আছে,”- বাংলাদেশের যে স্থানে কৃষি জমি রহিয়াছে তাহা এই আইনের মাধ্যমে সুরক্ষা করতে হবে এবং কোন ভাবেই তাহার ব্যবহার ভিত্তিক পরিবর্তন করা যাইবে না”
কিন্তু কোথায় সেই আইনের প্র‍য়োগ। গত কয়েক বছরে দেশে শুরু হয়েছে কৃষি জমি খনন করে পুকুর খননের হিড়িক। পুকুর খননে কৃষি জমির ধংসলীলা চললেও সেখানে প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকায়। যে কোন বিলেই পানি সেচ ও নিষ্কাশনের সুবিধার্থে ক্ষেত গুলো এক পাশে উঁচু ও পর্যায়ক্রমে ক্ষেত গুলো নিচু করা হয়, যাতে বৃষ্টির পানিও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না করতে পারে। কিন্তু পুকুর খননের ফলে বিলে দেখা দিয়েছে মারাত্নক জলাবদ্ধতা এবং কিছু ক্ষেত্রে এমনও হয়ছে জলাবদ্ধতার জন্য চাষাবাদ বন্ধ হয়ে গেছে।
পুকুর খনন কিভাবে এতো রমরমা ব্যবসা হয়ে গেলো এর কারন অনুসন্ধান করতে যা পেলাম তা কেঁচো খুড়তে সাপ বের হবার অবস্থা। পুকুর খনন করে সেখান থেকে উত্তোলিত মাটি চওড়া দামে বিক্রি হচ্ছে স্থানীয় ইট ভাটায়। মাটির স্তুপ করে পাহাড়ের মতো তৈরি করা হচ্ছে পরবর্তীতে ব্যবহারের জন্য। আবার এই ইট ভাটাও তৈরি হচ্ছে আইন অমান্য করে কৃষি জমিতেই।

পুকুর মালিকরা মাটি বিক্রি করে তাদের খরচ পুষিয়ে নিচ্ছে কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ভাবে (long term) এ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের কৃষকরা কারন সে জমিতে মাটি ভরাট দিয়ে আর কখনোই কৃষি কাজ করা সম্ভব না। কৃষকরাও তাদের ফসলের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে জমি দিতে আগ্রহী হচ্ছে, কিছু নগত টাকার লোভে। তাই এখনই আইনের যথাযত প্র‍য়োগ না হলে ভবিষ্যতে খাদ্য আমদানি নির্ভর একটা দেশে রূপান্তরিত হওয়ার মারাত্নক সম্ভাবনা লক্ষ করা যায়।
তৃতীয় যে সমস্যা সরোজমিনে লক্ষ করলাম সেটা আমাদের সেচ ব্যবস্থার। আমাদের দেশে সেচ ব্যবস্থার জন্য মূলত আমরা ground water এর উপর নির্ভরশীল। একেই পানি উত্তোলন ও এর যথেচ্ছ ব্যবহারে যেমন আস্তে আস্তে মরুকরনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, তেমনি ডিপটিউবয়েল গুলোর নিয়ন্ত্রন এলাকার প্রভাবশালী অসাধু রাজনীতিবিদদের হাতে হাতে চলে যাওয়ায় সেচ বাবদ প্রচুর টাকা ব্যয় হচ্ছে কৃষকের।যেখানে সরকার প্রতি অর্থ বছরেই সেচ ব্যবস্থায় ভর্তুকির ব্যবস্থা করে।ব্যাপারটা নিয়ে কৃষকদের নিয়ে একটু আলোচনা করতেই এই ব্যবস্থার সমস্যা ও সমাধান দুটোই নজরে এলো।যেমন রাজশাহী জেলার মোহনপুর থানার অনেক বিলের ডিপ টিউওবয়লের নিয়ন্ত্রন কিছু অসাধু রাজনীতিবিদের হাতে। তার ডিপটিউবয়লের আওতায় যেসব ফসলি জমি আছে শুধু বোরো মৌসুমেই বিঘা প্রতি কৃষককে ৩০০০ টাকা সেচ খরচ দিতে হয়। গ্রামের মানুষ মাঝে মাঝে এর প্রতিবাদ করলেও তেমন কাজে আসে নি।

ঠিক অন্যদিকে কিছু বিলের ডিপ টিউবয়েল নিয়ন্ত্রণ কৃষকদের হাতে। তারা কৃষক সমিতি গঠন করেএটা চালায়। এক এক সিজনে খরচ হয় তা মাথাপিছু হারে সবার অংশগ্রহনে দেওয়া হয়। এ বছর বোরো মৌসুমে তাদের খরচ পড়েছে বিঘাপ্রতি মাত্র ৯০০ টাকা। সমাধানটা আপনার চোখের সামনেই।

দেশের কৃষি খাতের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা মৃত নদী ও নদী প্রবাহের বেহাল দশা। ড্রেজিং এর অভাবে নাব্যতা হারিয়ে ও ভারতের নদী রাজনীতির প্রভাবে নদীগুলো মৃতপ্রায়। কিন্তু একটা সময় এতো আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ডিপ টিউবয়েল না থাকলেও দেশের নদ নদী খাল থেকে প্রয়োজনীয় সেচ সরবারাহ করা সম্ভব হয়েছে।এক সমীক্ষায় দেখা গেছে দেশে বর্তমানে এক হাজার চারশত ঊনসত্তরটির অধিক খাল রয়েছে। তাছাড়া আরো রয়েছে কিছু মরা খাল। তাই নদীগুলোর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিতের লক্ষে যদি নদী খাল গুলোর সংস্কার এবং স্বল্প পরিসরে নদী-খাল সংযোগ করা হয় তাহলে তা যেমন সেচ কাজে অবদান রাখবে তার সাথে বন্য নিয়ন্ত্রণ ও মৎস্য চাষেও অবদান রাখবে।
পরিশেষে বলা যায়, আমাদের কৃষক সম্প্রদায়ই একমাত্র গোষ্ঠী যারা আমাদের কোন রূপ ক্ষতি না করে উপকার করেন। তাই কৃষকের অধিকার খর্ব হলে এর থেকে পরিতাপের কিছু নেই। কৃষকের উৎপাদিত পন্যের ন্যায্যমূল্য পেতে কৃষি অর্থনীতিবিদদের সঠিক ব্যবহার, কৃষি আদালতও স্বল্প সুদে ঋন ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে। কৃষকের নানা সমস্যার জন্য হটলাইন নাম্বার চালু ও তার ব্যপক প্রচার করতে হবে। আমি মনে করি এই দেশে কৃষক ও মাটির মধ্যকার সম্পর্ক টিকে থাকবে ততদিন আমরা পিছিয়ে পড়বো না। যেমন ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের আগে আগে কৃষি বিপ্লব ঘটেছিল যা শিল্পবিপ্লবের ভিতকে মজবুত করেছিল।তাই কৃষকের সমস্যার টেকসই সমাধান ( Sustainable solution) অত্যন্ত জরুরি। নিজে যখন কৃষি কাজ করে শোষন, লাঞ্চনা-বঞ্চনা ছাড়া কিছু পান না ফলে তিনি চান তার সন্তান যেন তার মত জীবন না কাটায়।একবার ভাবুন তো এই কৃষি কাজ যদি কেউ না করে আপনাদের মত চাকুরিজীবি মানুষরা কি খাবে?

লেখক:- খন্দকার ফজলে রাব্বী।
চতুর্থ বর্ষ
কৃষি ও অর্থনীতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

(বিঃ দ্রঃ সত্যের সকালের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, সত্যের সকাল কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার সত্যের সকাল নিবে না)

পূর্ববর্তী খবরজঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে নওগাঁ জেলা যুবলীগের বিক্ষোভ সমাবেশ
পরবর্তী খবরনতুন করে পাবনায় ১৯জনের করোনায় আক্রান্ত।

Leave a Reply