গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ‘হারিকেন’ এখন অতীত

গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য 'হারিকেন' এখন অতীত

মোঃ আনাস মোল্লা, বিশেষ প্রতিবেদকঃ- সভ্যতার বিকাশে, বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি কল্যাণে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলা ঐতিহ্য এক সময়ের রাত্রিকালীন বন্ধু নামে ক্ষ্যাত ”হারিকেন বা কুপিবাতি“।

গ্রামীন বাংলার গ্রামগুলোতে সে কালে ছিলো না কোন বিদ্যুৎতের আলো, ছিলো না কোন আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়া। সেই সময় বাঙ্গালীর জীবনে রাতের অন্ধকার দূর করতে গ্রামের মানুষের অন্যতম ভরসা ছিল হারিকেন, কুপি ও হ্যাজাক বাতি। যার অন্যতম জ্বালানি উপাদান ছিল কেরোসিন। তখনকার সময় এসব জ্বালিয়ে গ্রামাঞ্চলে রাতে বিয়ে-সাদি যাত্রাগান, প্রেনিগান, মঞ্চ নাটক, ওয়াজ মাহফিল কিংবা বাড়িতে দোয়ার অনুষ্ঠান করা হতো।

হারিকেন জ্বালিয়ে বাড়ির উঠানে কিংবা ঘরের বারান্দায় ভাই-বোন একসাথে পড়াশোনা করতো। হারিকেনের জ্বালানি উপাদান কেরোসিন আনার জন্য কাচের বোতল ছিল।

গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য 'হারিকেন' এখন অতীত
হারিকেন বা কুপবাতি ( ছবিঃ সংগ্রহীত )

মাগরিবের নামাজের আগে কেরাসিন তেলের দোকানে এক রকমের ভিড় লেগে যেতো, কেননা গ্রামের মা, মাসীরা সন্ধ্যার আগেই হারিকেন প্রস্তুত করতো। রাত জেগে ধান ভানতো, ঢেঁকি চালাতো এই হারিকেনের আলোয়। তেল যখন কমে আসতো তখন দেখা যেত আলোও কমে আসছে। তেলের উপর নির্ভর করতো আলোর পরিমাণ।

সেই সময় গ্রামাঞ্চলের প্রতিটি বাড়িতে হারিকেন দেখা যেত। তখন হারিকেন মেরামত করতে বিভিন্ন হাট বাজারে মিস্ত্রী বসতো। গ্রামের প্রতিটি হাট বাজারে ছিল হারিকেন মেরামত করার অস্থায়ী দোকান। তারা বিভিন্ন হাট বাজার ঘুরে ঘুরে হারিকেন মেরামতের কাজ করতেন।

কিন্তু আজ অত্যন্ত দুঃখ নিয়ে বলতে হয় এক সময়ের রাত্রীকালীন বন্ধু হারিকেন আজ বিদ্যুতের দাপটে অতীত তাই হারিকেন মিস্ত্রীদেরও আর দেখা যায় না। এখন ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। রাস্তা-ঘাট, হাঁট-বাজারে সব খানে এখন বিদ্যুতের দাপট। বিজ্ঞানের এই আবিষ্কার নিঃসন্দেহে জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে এনেছে। তবে হারিয়ে গেছে আমাদের গ্রাম বাংলা ঐতিহ্য ও ইতিহাস।

এমনও সময় ছিলো যখন, দেখা যেতো হারিকেন হাতে নিয়ে ডাকপিয়ন ছুটে চলেছেন গ্রামের পর গ্রামে। বৃদ্ধ থেকে শুরু করে সবাই রাতের বেলাই হারিকেন হাতে নিয়ে বের হতেন। হারিকেনের আলো গৃহস্থালির পাশাপাশি ব্যবহার হতো বিভিন্ন যানবাহনে।

এখন গ্রামের পর গ্রাম বিদ্যুতের আলোতে আলোকিত হয়ে গেছে। বিদ্যুতের ঝলকানিতে অজ পাড়া গ্রাম গুলো এখন পল্লী শহরে রুপান্তরিত হয়েছে। কাজেই সেকালের ঐতিহ্যবাহী হারিকেনের আলোর প্রয়োজন আর প্রয়োজন হচ্ছে না। বর্তমানে বৈদ্যুতিক বাতির ব্যাপক প্রসারে কমে গেছে হারিকেনের চল।

প্রথম হারিকেনের বর্ণনা পাওয়া যায় আল রাযীয়ের বই “কিতাব আল আছার”। যেখানে তিনি হারিকেন কে নাফতা বলে উল্লেখ করেন।

“হারিকেন” টিমটিমে আলোয় কি এক নৈসর্গিক ছায়া। গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী একটি নিদর্শন। কত যে গল্প, কবিতা আর উপন্যাসে হারিকেনের উপমা ব্যবহার হয়েছে তার শেষ নেই।

হারিকেন নিয়ে যত কবিতা ছড়া, গল্প রয়েছে-
“এক্কা-দোক্কা প্রহর, বউছি, ডাংগুলি, হা-ডু-ডু, ফুটবল, ক্রিকেট/
নিভু নিভু আলো, গা ছমছম নিকষ আঁধার, কুয়াশা টুপটাপ শব্দ/
ফিরে আসে বারবার অন্তরে জাজ্বল্যমান হয়ে, না ফেরানো বেলা/
কখনো ভোরে কখনো দুপুরে কখনো বিকেলে শান্ত পরিবেশে/
ফিরে সেই হারিক্যান সন্ধ্যা, ফিরাতে জানায় নি:শব্দ আহূতি….”

এক সময় হয়তো চিরতরে বিলুপ্ত হবে হারিকেন। তখন হয়তো যাদুঘরে দেখা যাবে হারিকেন।

পূর্ববর্তী খবরনানা কর্মসূচির মাধ্যমে নোবিপ্রবি তে পালিত হলো বিভীষিকাময় ২১ আগষ্ট
পরবর্তী খবরএকদিনে বিশ্বে সংক্রমণ কমেছে সোয়া লাখ

Leave a Reply