নারীকে এগোতে না দিলে সমাজ চলবে খুঁড়িয়েঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

ছবি :- বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট

নারীকে এগোতে না দিলে সমাজ চলবে খুঁড়িয়েঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

 

জনসংখ্যার অর্ধেকই যেখানে নারী, সেখানে তাদের পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ না দিলে সমাজও এগোতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বেগম রোকেয়া দিবসে বুধবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রোকেয়া পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে তিনি এই কথা বলেন।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “একটা সমাজে যেখানে অর্ধাংশ নারী, একটা সমাজকে যদি উন্নত করতে হয়,… তারা সমানভাবে যদি নিজেদের তৈরি করতে না পারে, তাহলে সেই সমাজ কীভাবে গড়ে উঠবে?

 

“সমাজের অর্ধাংশকে আমরা যদি এগোতেই না দিই, তাহলে কী করে একটা সমাজ দাঁড়াতে পারে। সমাজকে তো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হবে।”

 

এ অনুষ্ঠানে নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতিতে ভূমিকার জন্য পাঁচজনকে চলতি বছরের বেগম রোকেয়া পদক দেওয়া হয়।

 

নারী শিক্ষায় অবদানের জন্য অধ্যাপক শিরীণ আখতার এবং পেশাগত উন্নয়নের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে ভূমিকার জন্য কর্নেল ডা. নাজমা বেগম এবার রোকেয়া পদক পেয়েছেন।

 

নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবদানের জন্য মঞ্জুলিকা চাকমা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে নারী জাগরণের ক্ষেত্রে ভূমিকার জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা বেগম মুশতারী শফি এবং নারীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফরিদা আক্তার এ সম্মাননা পেয়েছেন।

 

প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে পদকজয়ীদের হাতে সম্মাননা, সনদ ও চেক তুলে দেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা।

 

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে সশরীরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে না পারায় নিজের দুঃখের কথা অনুষ্ঠানে প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

 

তিনি বলেন, “আজকে আমাদের মেয়েরা অনেক এগিয়ে গেছে। আমরা চাই আমাদের দেশের মেয়েরা সমানভাবে এগিয়ে যাক। কারণ বেগম রোকেয়াই আমাদের পথ দেখিয়ে গেছেন।”

 

সমাজে নারীর ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে নিজের মা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিবের কথাও স্মরণ করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।

 

তিনি বলেন, “আমার মা, যিনি সারাজীবন আমার বাবার পাশে থেকে এই স্বাধীনতা সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন… যখন আমার বাবা জেলে থাকতেন, তখন দল গঠন থেকে শুরু করে আন্দোলন সংগ্রাম করা বা তার মামলা মোকদ্দমা দেখা বা আমাদেরকে মানুষ করা, লেখাপড়া শেখানো- সব দায়িত্ব কিন্তু আমার মা নিজে করেছেন।

 

“কাজেই সেখানেও আমি দেখি… সমাজে কত বড় দায়িত্ব তিনি পালন করে গেছেন। অথচ কোনো প্রতিষ্ঠনিক শিক্ষার সুযোগ তার ছিল না, কারণ সেই যুগে মেয়েরা একটু বড় হলে আর তাদেরকে স্কুলে যেতে দেওয়া হত না, পড়তে দেওয়া হত না। আমি দেখেছি, আমার মা খুব জ্ঞানপিপাসু ছিলেন এবং নিজের চেষ্টায় তিনি অনেক লেখাপড়া করতেন, আমাদেরকে সব সময় লেখাপড়া করতে উৎসাহিত করতেন।”

 

নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রতিবছর রোকেয়া পদক দেয় বাংলাদেশ সরকার।

 

১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বেগম রোকেয়া। ১৯৩২ সালের একই তারিখে কলকাতার সোদপুরে তার মৃত্যু হয়।

 

রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার ব্যবস্থায় নারীর সমান অধিকারের জন্য আমৃত্যু লড়াই করেছেন মহিয়সী এই নারী। বাল্যবিবাহ, যৌতুক, পণ প্রথা, ধর্মের অপব্যাখ্যাসহ নারীর প্রতি অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন।

 

মতিচূর, সুলতানার স্বপ্ন, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী ইত্যাদি কালজয়ী গ্রন্থে ধর্মীয় গোঁড়ামি, সমাজের কুসংস্কার ও নারীর বন্দিদশার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন তিনি।

 

তৎকালীন সমাজের অচলায়তন ভেদ করে বেগম রোকেয়া যে নারীদের আলোর পথ দেখিয়েছিলেন, সে কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “তিনি সমাজের একটা বিবর্তন নিয়ে এসেছিলেন। এবং নিজের উদ্যোগে, অনেক প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে তিনি এই দেশের নারী সমাজকে এগিয়ে নিয়ে আসেন এবং তাদের শিক্ষায় আলোকিত করেন।”

 

রোকেয়ার লেখা থেকে উদ্ধৃত করে শেখ হাসিনা বলেন, “তিনি বলতেন, ‘কন্যাগুলিকে সুশিক্ষিত করিয়া কার্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দাও। নিজের অন্ন, বস্ত্র উপার্জন করুক।”

 

সেই সময়ের সমাজে নারী শিক্ষার বাধাগুলো দূর করতে রোকেয়ার সংগ্রামের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বেগম রোকেয়া তার ভাইয়ের থেকে শিক্ষা নিয়েছেন, পরবর্তীতে স্বামীর থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তার নামে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে নারীদের স্কুলে আনতে গেলে সেই সময় অনেক বাধার মুখোমুখি হতে হত তাকে।

 

“কষ্ট করেই তিনি শিক্ষার আলোটা জ্বালিয়ে দিয়ে যান আমাদের জন্য। যার জন্য আজকে আমরা বলতে পারি, মেয়েরা অনেক সুযোগ আমরা পেয়েছি।”

 

দেশের স্বাধীনতা অর্জন থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অবদানের কথা এ অনুষ্ঠানে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। স্বাধীনতার পর নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে জাতির পিতার নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন।

 

তিনি বলেন, “নারীরা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হলে পরিবারে তার একটা গুরুত্ব থাকে এবং কীভাবে তারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হবেন- জাতির পিতা সেটা নিয়ে সব সময় চিন্তা করতেন।

 

“আমরা সরকার গঠন করার পর থেকে সব সময় এই দিকটায় উদ্যোগ নিয়েছি। নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা, নারীদেরকে বেশি সুযোগ দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকরি- সবক্ষেত্রে যেন তারা অবস্থানটা দৃঢ করতে পারে, আমরা কিন্তু সেই ব্যবস্থাটা নিয়েছি।”

 

নারীর শিক্ষা নিশ্চিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা বৃত্তি দিচ্ছি, উপবৃত্তি দিচ্ছি। এমনকি আপনারা জানেন, প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষের উপর যে উপবৃত্তি দিই, সেই বৃত্তির টাকাটা সোজা মায়ের নামে চলে যায়।”

 

বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে রোকেয়া দিবসের এ অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা ও সচিব কাজী রওশন আক্তার উপস্থিত ছিলেন।

মিনহাজুল ইসলাম/ দৈনিক সত্যের সকাল

পূর্ববর্তী খবরখালেদা জিয়া-তারেকের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন খারিজ
পরবর্তী খবরটাইমের ‘বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব’ বাইডেন-হ্যারিস

Leave a Reply