পথশিশু; আগামীর ভবিষ্যৎ? নাকি জাতির বোঝা?

প্রবাদ আছে আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ’! আবার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘তুমি নও শিশু দুর্বল, তুমি মহৎ ও মহীয়ান, জাগো দুর্বার, বিপুল বিরাট অমৃতের সন্তান।’

কিন্তু যখন এই শিশু শব্দটির আগে ‘পথ’ শব্দটি যুক্ত হয়ে ‘পথশিশু’ হয়ে যায়, তখন সমগ্র দৃশ্যপটই পাল্টে যায়। চোখের সামনে ভেসে আসে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, মাদকাসক্ত, শিক্ষার ছোয়াহীন এমন একটি সম্প্রদায়। 

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল দেশ। মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩তম। এদেশে বসবাস ১৬ কোটি ৫৭ লাখ মানুষের। উইকিপিডিয়া’র তথ্য মতে, এদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে।

সরকারী ও কিছু বেসরকারী হিসেব মতে, এই বিপুল জনসংখ্যার ৪০-৪৫ শতাংশ, মানে প্রায় ৬ কোটিরও বেশি শিশু। আর এদের মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ শিশুই– ‘পথশিশু’। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট (বিআইডিএস) ও ইউনিসেফের ২০০৫ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়, ‘দেশে ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৭২৮ জন পথশিশু রয়েছে। কেবল ঢাকা শহরে রয়েছে ৭ লাখ পথশিশু। ২০১৮ সাল শেষে দেশে এর সংখ্যা দাঁড়াবে ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৫৪ জনে। আর ২০২৪ সাল নাগাদ এ সংখ্যাটা হবে ১৬ লাখ ১৫ হাজার ৩৩০ জনে।’

জাতিসংঘের তথ্যমতে, বর্তমানে এদেশে প্রায় ১০ লাখ পথশিশু রয়েছে, যাদের মধ্যে ঢাকাতেই আছে প্রায় দুই লাখ। 

অতিরিক্ত জনবহুল এই দেশের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে এই পথশিশুরা। আর এরাই এদেশের সর্বনিম্ন সামাজিক স্তরে বসবাস করে। সর্বনিম্ন সামাজিক স্তরে বসবাসের দরুন তাদের সম্মুখীন হতে হয় নানান ধরণের সামাজিক সমস্যার। মানুষের মৌলিক চাহিদাসমূহের প্রায় সবগুলো থেকেই বঞ্চিত তারা। 

এসব চাহিদা মেটানোর জন্য তাদের দিতে হচ্ছে শিশুশ্রম। জড়িত হতে হচ্ছে নানাবিধ অপরাধের সাথে। এর মধ্যে অন্যতম অপরাধগুলো হচ্ছে, মাদকব্যবসা, চুরি, ছিনতাই, অপহরণ, অস্র চোরাচালান ইত্যাদি। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. খন্দকার মোকাদ্দম হোসেন বলেন, ‘পথশিশুদের অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষার অভাব এবং দারিদ্রতা মূল ভূমিকা পালন কর। এছাড়া পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার অভাবও সমানভাবে দায়ী।’

প্রকৃতপক্ষে, এসব অপরাধগুলোর সবগুলোর সাথেই বিরাট কোনো না কোনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। এসব অসাধুচক্রগুলো সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বাধ্য করছে নানাবিধ অপরাধের সাথে জড়িত হওয়ার জন্য।

বেসরকারি সংগঠন ‘অ্যাকশন এইডে’র কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেছেন, ‘ভিক্ষা ছাড়াও চুরি, ছিনতাই এবং মাদকের ব্যাবসা এদের দিয়ে করানো হচ্ছে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘পথশিশুদের মধ্যে সবথেকে ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় আছে মেয়ে শিশুরা। তাদের উপর যে শারীরিক এবং যৌন নির্যাতন হয়, সেটি নিয়ে আমরা বেশি আতঙ্কগ্রস্থ।’

অন্যদিকে বিশাল এই জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ শিশুই মাদকাসক্ত। পথশিশুদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের মতে, মাদকাসক্ত ৮০ শতাংশ পথশিশু মাত্র সাত বছরের মধ্যে অপরাধমূলক কাজের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের মতে, ঢাকায় মাদকাসক্ত শিশুদের মাদক গ্রহণ ও বিক্রয়ের সাথে জড়িত ৪৪ শতাংশ, পিকেটিংয়ে জড়িত ৩৫ শতাংশ, ছিনতাই, চুরি ও অন্যান্য অপরাধের সাথে জড়িত ২১ শতাংশ শিশু। এসব নানান ধরণের অপরাধের সাথে জড়িত হয়ে এসব শিশু-কিশোর একসময় সমাজের শীর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়। 

বর্তমানে এসব পথশিশুদের পাশে সরকারি- বেসরকারি নানা সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। ইউনিসেফ, বাংলাদেশ স্ট্রিট চিলড্রেন ফাউন্ডেশন, দ্য স্ট্রিট চিলড্রেন অ্যাকটিভিস্ট নেটওয়ার্ক, ঢাকা আহসানিয়া মিশন, চিলড্রেন ফেরদৌস, জাগো ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ স্ট্রিট চিলড্রেন অর্গানাইজেশন, ওইসআরিয়ান, সুএমবাকোনা ইত্যাদি সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত পথ শিশুদের সহায়তা প্রদান করে আসছে। 

বাংলাদেশের সমন্বিত কমিউনিটি ও ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ এজেন্সি শারীরিক ও যৌন নির্যাতিত শিশুদের অবস্থার উন্নতির জন্য কাজ করে চলছে। 

এতগুলো সংগঠন কাজ করার পরেও পথশিশুদের জীবনমানের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে শিশু অধিকার বিষয়ক আইন থাকলেও তার প্রোয়োগ চোখে পড়ার মত না। ‘শিশুদিবসে’ গুটিকয়েক পথশিশুদের নিয়ে দিনটিকে উদযাপন করার মধ্যেই আমাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকে। বছরের অন্যান্য দিনে এসব শিশুদের কথা ভাবার কারো প্রয়োজনই পড়ে না। 

মূলত একটি বিশাল অঙ্কের শিশুদের অধিকার বঞ্চিত রেখে কোনো জাতিরই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। পথশিশুরা যদি এভাবেই সুবিধাবঞ্চিত হতে থাকে, তবে দেশের উন্নয়নের স্বপ্নও অধরাই থেকে যাবে।

একটা জাতির ভবিষ্যৎ সাফল্য নির্ভর করে সেই জাতির যথাযথ শিক্ষার উপরে। তাই প্রতিটি পথশিশুকে শিক্ষার গণ্ডীর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি শিশু হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সকল অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। 

জাতির উন্নয়নের জন্য আমাদের পথশিশু মুক্ত সমাজ গড়তে হবে। এজন্য যথাযথ কতৃপক্ষের আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রত্যেকে তার নিজ অবস্থান এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পথশিশুদের পাশে এসে দাঁড়ালে এই সামাজিক সমস্যা থেকে এদেশ অচিরেই মুক্তি পাবে। 

লেখকঃ তাহসিন হাসান।
শিক্ষার্থী- পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
সেশনঃ ২০১৮-১৯

(বিঃ দ্রঃ সত্যের সকালের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, সত্যের সকাল কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার সত্যের সকাল নিবে না)

পূর্ববর্তী খবরযশোরে শশুরের বিরুদ্ধে পুত্র বধূকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ
পরবর্তী খবরঈশ্বরদীতে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষন উদ্বোধন

Leave a Reply