পরমাণু সমঝোতার ব্যাপারে ইউরোপের দ্বিমুখী নীতি: বেরিয়ে এসেছে আসল চেহারা

ছবি:- সংগৃহীত

ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতা অর্জনে ইউরোপের তিনটি প্রভাবশালী দেশ অর্থাৎ জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র বেআইনিভাবে এ সমঝোতা থেকে বেরিয়ে গেলেও এটিকে রক্ষার দায়িত্ব ছিল ইউরোপের। কিন্তু ইউরোপ মৌখিকভাবে এ সমঝোতা টিকিয়ে রাখার কথা বললেও এটি বাস্তবায়নে আজো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি পরমাণু সমঝোতার বিষয়ে এখন যে নীতি নিয়েছে তা তাদের দ্বিমুখী নীতির পরিচায়ক। ওই তিনটি দেশের কর্মকর্তারা দাবি জানাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রকে পরমাণু সমঝোতায় ফিরিয়ে আনতে হলে এই সমঝোতার বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন আনতে হবে এবং নতুন করে চুক্তিতে উপনীত হতে হবে। পরমাণু সমঝোতায় দেয়া প্রতিশ্রুতি পালনে ইউরোপ ও আমেরিকার ব্যর্থতার বিষয়টিকে উপেক্ষা করে নতুন করে তারা এসব দাবি তুলেছে। তারা এও বলেছে, পরমাণু সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রের ফিরে আসাটাই যথেষ্ট হবে না।

ইরানের সঙ্গে পরমাণু সমঝোতার বিষয়ে করণীয় ঠিক করার জন্য বার্লিনে সম্প্রতি ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠকে মিলিত হন। ওই বৈঠকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসন পরমাণু সমঝোতা রক্ষায় এগিয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে তারা পরমাণু সমঝোতা লঙ্ঘনের দায়ে ইরানকে অভিযুক্ত করে এ চুক্তি পুরোপুরি মেনে চলার জন্য তেহরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

এই তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ ঘোষণার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক পরিষদ গত ৩০ নভেম্বর এক বিবৃতিতে পরমাণু সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। একইসঙ্গে পরমাণু সমঝোতাকে আরো শক্তিশালী করার জন্য আমেরিকার নীতির সঙ্গে মিল রেখে দেশটির নতুন সরকারে সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছে এই পরিষদ। ইউরোপের বর্তমান ও সাবেক কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত এই পরিষদের বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ইউরোপীয় দেশগুলোর উচিত ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া এবং আমেরিকার নতুন সরকারকেও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করা।

পরমাণু সমঝোতার ব্যাপারে ইউরোপের দ্বিমুখী নীতি: বেরিয়ে এসেছে আসল চেহারা
জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাইকো মাস

জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাইকো মাস সম্প্রতি সাপ্তাহিক স্পাইগেলকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতার বিষয়ে আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে পরামর্শ করা হবে। তিনি আরো বলেন, কেবল সাবেক পরমাণু চুক্তিতে ফিরে আসাই যথেষ্ট হবে না এবং পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের যে প্রভাব রয়েছে তা থেকেও তেহরানকে সরে আসতে হবে।

এদিকে, ফ্রান্স সরকারও নিজেরা পরমাণু সমঝোতা মেনে না চলার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে পরমাণু সমঝোতায় পুরোপুরি ফিরে আসার জন্য ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তার ভাষায় পরমাণু অস্ত্র যাতে কিছুতেই ইরানের হাতে না পড়ে সে নিশ্চয়তা আদায় করার কথা উল্লেখ করে দাবি করেছেন, আমেরিকার নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও মনে করেন, ‘ইরান যদি পরমাণু সমঝোতায় দেয়া প্রতিশ্রুতিতে ফিরে আসে তাহলে পরমাণু সমঝোতার বিষয়ে বর্তমান মার্কিন নীতি পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।’ পরমাণু সমঝোতার অংশীদার ব্রিটেনও একই নীতি নিয়েছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বোন ওয়েলস ইউরোপীয় ত্রয়িকা অর্থাৎ জার্মানি, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের পক্ষ থেকে পরমাণু সমঝোতা লঙ্ঘনের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে এ সমঝোতার প্রতি লন্ডনের সমর্থনের কথা উল্লেখ করে দাবি করেছেন, ইরান তার প্রতিশ্রুতিতে অটল থাকবে বলে আমরা আশা করছি। আমেরিকারও এ সমঝোতায় ফিরে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি। যদিও হোয়াইট হাউজের কট্টরপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন।  ব্রিটেনের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্ক সিডউইল ইরানের ব্যাপারে তার দেশের পুরানো দাবির পুনরাবৃত্তি করে বলেছেন, নতুন করে পরমাণু সমঝোতা হতে হবে।

ইউরোপীয় ত্রয়িকা অর্থাৎ জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্রিটেন এমন সময় পরমাণু সমঝোতার ব্যাপারে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের নীতি অনুসরণ করছে যখন তারা নিজেরা আজ পর্যন্ত পরমাণু সমঝোতার একটি ধারাও বাস্তবায়ন করেনি। এমনকি মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ইরানের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার জন্য ইউরোপ অর্থ সরবরাহ বিষয়ক বিশেষ ব্যবস্থা ‘ইন্সটেক্স’ চালুর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাও বাস্তবায়ন করেনি। এখন তারা নতুন করে পরমাণু সমঝোতার কথা বলছে। এদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেল আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন পরমাণু সমঝোতায় ফিরে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন যতটুকু মনে পড়ে বাইডেন পরমাণু সমঝোতায় ফিরে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। ব্রিটেনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ববি নাদেরি বলেছেন, পরমাণু সমঝোতার অংশীদার ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি জো বাইডেনকে এ চুক্তিতে ফিরে এসে প্রতিশ্রুতি পালনের আহ্বান জানিয়েছে।’

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইউরোপ মুখে এ সমঝোতার প্রতি সমর্থন জানালেও ইরান বিরোধী মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মোকাবেলায় কিছুই করেনি। তারা নিজেরা তো কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি এমনকি ইরানের সঙ্গে পাওনাদারের মতো আচরণ করছে। এমনকি ইউরোপের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জবাবে ইরান ফের পরমাণু কার্যক্রম শুরু করায় ইউরোপীয় ত্রয়িকা ইরানের সমালোচনা করেছে। ইউরোপীয় ত্রয়িকা অর্থাৎ ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি সম্প্রতি এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানের নাথাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রে নতুন অত্যাধুনিক সেন্ট্রিফিউজ স্থাপনের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে গভীর  উদ্বেগ প্রকাশ করে একে পরমাণু সমঝোতার লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। এ ব্যাপারে ইরানের সংসদে প্রস্তাব পাশের কথা উল্লেখ করে তারা দাবি করেছে, ‘তাদের এ পদক্ষেপ পরমাণু সমঝোতায় দেয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ইরান যদি কূটনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে চায় তাহলে তাদেরকে অবশ্যই পরমাণু কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ থেকে সরে আসতে হবে।’ 

ইউরোপের এ ধরনের কথার জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাঈদ খাতিবযাদেহ বলেছেন, ইউরোপকে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে তাদের আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে হবে। তিনি বলেন, ইউরোপ যদি নিজের প্রতিশ্রুতিতে অটল থাকে তাহলে ইরানও পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইউরোপীয় ত্রয়িকা বহুবার বলেছে, পরমাণু সমঝোতা আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং সে কারণে এটিকে রক্ষায় তারা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে। কিন্তু মার্কিন চাপের কাছে তারা নিজেদের অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। মার্কিন সরকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখন ইউরোপও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাবের বিষয়টি আলোচনার টেবিলে উত্থাপনের দাবি তুলেছে। কিন্তু ইরান এসব বিষয়ে আলোচনার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়েছে।#

পার্সটুডে/রেজওয়ান হোসেন/২৫

পূর্ববর্তী খবরপ্রাইভেট কারসহ ১০০ বোতল ফেনসিডিল জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ।
পরবর্তী খবরঝিনাইদহে বিকাশের এজেন্ট প্রতারণার ফাঁদে!

Leave a Reply