শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে

করোনার মতো অতিমারিতে দেশের অর্থনীতি ও শিক্ষা আজ বড় বিপন্ন। একে কেন্দ্র করে সমাজে অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতা আজ বেড়েই চলছে। বেকারদের জন্য সরকারি চাকরি একেবারেই বন্ধ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে অনেকে চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে আর অনেকের চাকরি থাকলেও বেতন কমে গেছে। নন-এমপিওভুক্ত ও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকদের কথা আর না-ই বা বললাম। সমস্যা অন্যদিকেও—করোনায় চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার আজ নিঃস্ব, অসহায়। নতুন কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ দেখছি না, যেখানে সরকারকে প্রণোদনা দিয়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে দেখা যায়। বড় উদ্যোক্তা ও নিম্নবিত্তদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকলেও মধ্যবিত্তদের জন্য কোনো কিছুই নেই। তারা না পারছে অন্যের কাছে হাত পাততে, না আছে তাদের জন্য কোনো ব্যবস্থা। মঙ্গলবার (৩ আগস্ট) কালের কণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত উপসম্পাদকীয়তে এ তথ্য জানা যায়।

উপসম্পাদকীয়তে আরও জানা যায়, চলমান লকডাউনের মধ্যে সরকারের সিদ্ধান্তে দ্রুত পরিবর্তনে কলকারখানা খুলে গেল অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেই। এখানে কোনো চাপ আমরা অনুভব করছি না। নেই কোনো সুনির্দিষ্ট নিদের্শনা বা রোডম্যাপ। অথচ শিক্ষা একটি বড় এবং এতটাই গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র, যার ওপর নির্ভর করে আমাদের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিক্ষার্থীরা যদি ভালোভাবে না শিখে ডিগ্রি অর্জন করে, তাহলে আমরা ভবিষ্যতে বিপদে পড়ব। দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি তৈরি হবে। শিক্ষার্থীদের এভাবে বসিয়ে রাখাও কাম্য নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আমাদের দেশের বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণে যা দাঁড়ায় তা হলো, করোনা এত সহজে নির্মূল হওয়ার কোনো বিষয় নয়। করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৫ শতাংশের নিচে না এলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যাবে না—এমন ধারণা থেকেও আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের এমন একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যেখানে কিভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যায়, এর নির্দেশনা থাকবে।

আমরা টিকার স্বল্পতা অনেকটা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। মেডিক্যালের শিক্ষার্থীদের টিকার আওতায় আনার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমাদের প্রথম কাজ মেডিক্যাল কলেজগুলো খুলে দেওয়া এবং তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা। অন্তত ১৫ দিনেই আমরা বুঝতে পারব শিক্ষার্থীদের পদচারণে করোনার গতি-প্রকৃতি। এরপর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পালা। আমার জানা মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিকা দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে টিকা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা যেতে পারে। এখানেও আমাদের সব কিছু পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়ে একটু অপেক্ষা করা যেতে পারে। কেননা আমরা এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করতে পারিনি। অক্টোবর কিংবা নভেম্বরে পরীক্ষা নিলে ক্ষতি কী। তবে সব শিক্ষককে এ সময়ে টিকার আওতায় আনা জরুরি, যাতে করোনার বর্তমান ঢেউ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো খুলতে পারি। লাখ লাখ ভর্তীচ্ছুকে টিকার আওতায় এনে ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করা সম্ভব নয়। করোনা স্বাভাবিক হলে আমরা ভর্তি পরীক্ষা সশরীরে নিতে পারব, কিন্তু তা সম্ভব না হলে আমাদের বিকল্পও ভাবতে হবে। টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অগ্রাধিকার পাওয়া এখন সময়ের দাবি। কেননা শিক্ষকদের টিকা না দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা সম্ভব নয়। সরকার এরই মধ্যে ১১ আগস্টের মধ্যে সব শিক্ষককে টিকা নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছে। শিক্ষকদের উচিত, নির্দেশনা মেনে টিকা নেওয়া এবং নিজেদের পাঠদানের জন্য প্রস্তুত করা।

রোডম্যাপ অনুযায়ী আমরা প্রথমে কম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলার বিষয়ে চিন্তা করতে পারি। এমনকি কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে পরীক্ষা চালানো যেতে পারে। যখন আমাদের লকডাউন থাকে না, এমনকি লকডাউনের সময়ও হাট-বাজার, পথে-ঘাটে আমরা স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চলাচল করি, কিন্তু যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা ভাবব, তখন কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মানার কথাই ভাবতে হবে। ইউজিসি চেয়ারম্যানের এক সাক্ষাৎকারে আমরা জানতে পারলাম, আগামী দুই মাসের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পরিকল্পনার কথা। খুবই ভালো সংবাদ। আমরাও চাই, বিশ্ববিদ্যালয় খুলে যাক, কিন্তু এর জন্য প্রস্তুতি দরকার। সবার একই কথা, করোনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষা খাত। সরকার চাপে পড়ে হোক কিংবা অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য হোক, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রাখছে না, কিন্তু যৌক্তিক কারণেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে না। মাসের পর মাস এভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখলে এর প্রভাব আমাদের অর্থনীতিতে আজ হয়তো পড়ছে না, কিন্তু আগামী দিনে পড়বে। আমাদের রোডম্যাপের অন্যতম লক্ষ্য এমন এক প্রস্তুতি নেওয়া, যেখানে করোনার প্রকোপ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে পারি। সব পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের টিকার আওতায় এনে তাঁদের প্রস্তুত রাখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক হলগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি নির্দেশনা তৈরি করা, যেখানে স্বাস্থ্যবিধি না মানলে কী ধরনের শাস্তি পেতে হয়, তার উল্লেখ থাকবে। আমাদের প্রয়োজনেই আমাদের কঠোর হতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টারকে ঢেলে সাজানো উচিত। এখানে পর্যাপ্ত বেড, আইসোলেশন সেন্টার এবং অক্সিজেনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রয়োজনে জরুরি ভিত্তিতে ডাক্তার ও অন্যান্য সাপোর্ট স্টাফ নিয়োগ দিয়ে একটি ছোট হাসপাতালে রূপান্তরিত করতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি চৌকস স্বেচ্ছাসেবী দল তৈরি করতে হবে, যাদের কাজ হবে কোনো শিক্ষার্থী করোনায় আক্রান্ত হলে তাকে সার্বিক সহায়তা প্রদান করা। এ ছাড়া প্রতিটি আবাসিক হলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি তদারকি টিম গঠন করতে হবে। সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুল্যান্স প্রস্তুত রাখতে হবে। সার্বিক বিষয় তদারকির জন্য শিক্ষকদের নিয়ে একটি তদারকি ও সমন্বয় কমিটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে গঠন করতে হবে। প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ থাকতে হবে। কলেজ পর্যায়েও এমন নির্দেশনা ও তদারকির ব্যবস্থা থাকতে হবে। মোটকথা, শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়ার পাশাপাশি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় খোলার জন্য পূর্বপ্রস্তুতিমূলক একটি পরিকল্পনা এবং কিভাবে তা বাস্তবায়ন করা যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের বিশ্বাস, আমরা যদি দুই মাস সময় নিয়ে টিকা প্রদান এবং উল্লিখিত কাজগুলো করতে পারি তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুল খোলা কোনো সমস্যাই নয়।

লেখক : ড. নিয়াজ আহম্মেদ, অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

(বিঃ দ্রঃ সত্যের সকালের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির আইনগত, মতামত বা বিশ্লেষণের দায়ভার সম্পূর্ণরূপে লেখকের, সত্যের সকাল কর্তৃপক্ষের নয়। লেখকের নিজস্ব মতামতের কোনো প্রকার দায়ভার সত্যের সকাল নিবে না)

পূর্ববর্তী খবরকোভিডে ১৯ ভাইরাসে প্রাণ গেলো আরও ২৩৫ জনের, শনাক্ত ১৫ হাজার ৭৭৬
পরবর্তী খবরবদরগঞ্জে ফ্রি টেলিমেডিসিন চালু করল “আগামীর বাংলাদেশ

Leave a Reply